নাটোরের গুরুদাসপুর, বিশেষ করে চাঁচকৈড়—আমার বেড়ে ওঠা ও শিকড়ের জায়গা। পেশাগত ব্যস্ততায় বছরের বেশিরভাগ সময় ঢাকায় থাকলেও সুযোগ পেলেই এলাকায় আসি। সুপ্রিম কোর্টের ভ্যাকেশনে এবার একটু বেশি সময় থাকার সুযোগ হয়েছে, তাই নিজের শহরটাকে একটু কাছ থেকে দেখা ও বেশি করে ভাবার সুযোগ হলো। চাঁচকৈড় তথা গুরুদাসপুর পৌরসভা প্রথম শ্রেণির এবং চলনবিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কিন্তু নাগরিক সেবার মান ও শহরের সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়ে আমাদের আরও অনেক কিছু ভাবার আছে।
এখানকার প্রধান প্রধান রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। ড্রেনেজ ব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক জায়গায় পানি জমে যায়। ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট ও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ ও নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা জরুরি। বাজার ও হাট ব্যবস্থাপনাতেও চরম সমস্যা রয়েছে। আমাদের বড় হাটটি সপ্তাহে দুই দিন বসে—এত বড় একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্রের জন্য আরও পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা দরকার।
গুরুদাসপুরের অন্যতম বড় প্রাকৃতিক আশীর্বাদ আমাদের নদীগুলো। নন্দকুঁজা, আত্রাই ও গোমতী—এই তিনটি নদী আমাদের এলাকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এর মধ্যে নন্দকুঁজা নদী পৌরসভার বুক চিরে বয়ে গেছে। খুব কম শহরই এমন প্রাকৃতিক সৌভাগ্য নিয়ে গড়ে ওঠে।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এই নদীগুলোকে আমাদের উন্নয়ন ও সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে কাজে লাগাতে পারিনি। কোথাও দূষণ, কোথাও দখল, কোথাও নাব্যতা হারানোর সমস্যা—সব মিলিয়ে নদীগুলোর স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। প্রয়োজন অনুযায়ী নদী খনন, দখল ও দূষণমুক্ত করা এবং নদীকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা জরুরি।
নদীর পাড়গুলোকে পরিকল্পিতভাবে উন্নত করে সবুজায়ন, হাঁটার জায়গা, বসার স্থান ও বিনোদনের ব্যবস্থা করা গেলে আমাদের নদীগুলোই একদিন গুরুদাসপুরের সৌন্দর্য ও আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। একটি শহরের মধ্য দিয়ে একাধিক নদী বয়ে যাওয়া শুধু চরম সৌভাগ্য নয়—এটি আমাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নেরও মাইলফলক হতে পারে।
এখানে চুরি-ছিনতাইও মানুষের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে চুরির ঘটনা শোনা গেলেও এখন ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। অথচ শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রশাসন বা পৌরসভার উদ্যোগে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা নেই। আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে সিসিটিভি, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ এখন জরুরি।
হাট-বাজার ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা ও কার্যকর একটি বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি করা যেতে পারে। পৌরসভা, ব্যবসায়ী, ইজারাদার, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এমন একটি কমিটি থাকলে যানজট, পার্কিং, দোকান বসানো, ময়লা-আবর্জনা, পথচারীদের চলাচল ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অনেক বেশি কার্যকরভাবে দেখা সম্ভব।
বর্তমানে পৌরসভায় একজন প্রশাসক দায়িত্ব পালন করছেন। এটি স্বাভাবিকভাবেই একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা এবং তিনি দীর্ঘ সময় এখানে থাকবেন না। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি ভালো কিছু করার চেষ্টা করছেন বলে শুনছি। তাঁর সময়টুকুতে জরুরি নাগরিক সেবার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য কিছু কাজের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব।
পৌরসভার ভেতরের সমস্যাগুলোও কম নয়। দক্ষ জনবলের সংকট আছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত না হওয়ার বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। পৌরসভা আর্থিক সংকটে থাকলে নাগরিক সেবা ঠিকভাবে দেওয়া কঠিন। তাই পৌরসভার আয় বাড়ানো, কর আদায় নিশ্চিত করা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা ঠিক করা এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাও জরুরি।
আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—পৌরসভার কোনো উন্নয়ন প্রকল্প শুধু গ্রহণ করলেই সেটিকে উন্নয়ন বলা যায় না। প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হলো, কত টাকায় কাজ হচ্ছে, কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা কত, কাজটি কে বাস্তবায়ন করছে এবং কাজের মান কে যাচাই করছে—এসব তথ্য নাগরিকদের জানার সুযোগ থাকতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
আমাদের দেশে অনেক সময় একটি রাস্তা বা ড্রেন তৈরি করাকেই উন্নয়ন হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সেটি নির্মাণের পর কত বছর ভালো থাকে, বর্ষায় টিকে থাকে কি না, নির্ধারিত মান অনুযায়ী তৈরি হয়েছে কি না—এসবও প্রকৃত উন্নয়নের অংশ। শুধু কাজ শেষ করাই নয়, কাজের মান ও স্থায়িত্বও নিশ্চিত করতে হবে।
পৌরসভা শুধু মেয়র ও কাউন্সিলরদের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এই শহরের নাগরিকদের প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এ নাগরিকদের মতামত ও অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় একই ধরনের কয়েকজন সাংবাদিক বা রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়ে মতবিনিময় সভা করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়। এতে প্রকৃত নাগরিক মতামত পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, প্রকৌশলী, তরুণ, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের নিয়ে অর্থবহ মতবিনিময় হওয়া দরকার। শুধু সভা করলেই হবে না, সেই মতামতের বাস্তব প্রতিফলনও থাকতে হবে।
নাগরিক সেবার ক্ষেত্রেও একই কথা। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ পৌরসভার বিভিন্ন সেবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাওয়ার বিষয়টি নাগরিকের অধিকার। পৌরসভা নাগরিকদের কাছ থেকে কর নেয়। সেই করের বিনিময়ে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা পৌরসভার দায়িত্ব। তাই নাগরিক যেমন নিয়মিত কর দেবেন, তেমনি পৌরসভাকেও তার বিনিময়ে সময়মতো ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করাও শুধু নাগরিকের দায়িত্ব নয়। পৌরসভাকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্যও আমাদের আরও ভাবতে হবে। এলাকায় মাঠ আছে, কিন্তু নিয়মিত খেলাধুলার চর্চা খুব একটা দেখা যায় না। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও কোনো সংগঠিত উদ্যোগ নেই। একটি শহর শুধু রাস্তা-ঘাট আর ভবন দিয়ে তৈরি হয় না; খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিনোদন ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশও একটি শহরের জীবনের অংশ।
গুরুদাসপুর ও চাঁচকৈড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস ও ব্যবসা করে আসছেন। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ এই এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি এলাকার মানুষ কতটা সভ্য, নিরাপদ ও মানবিক—তার একটি বড় মাপকাঠি হলো সেই এলাকার সংখ্যালঘু নাগরিকরা কতটা নিরাপদ, সম্মান ও স্বস্তির সঙ্গে বসবাস করছেন। ধর্ম বা পরিচয়ের কারণে কেউ যেন নিজেকে অনিরাপদ বা বঞ্চিত মনে না করেন—এটা শুধু প্রশাসনের নয়, আমাদের সবার দায়িত্ব।
আমাদের এলাকার আরেকটি বড় শক্তি হলো—বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক, আত্মীয়তা ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু এই সামাজিক সম্পর্ককে যদি শহরের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করা যায়, তাহলে অনেক কিছুই সম্ভব।
রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা, নিরাপত্তা, বাজার ব্যবস্থাপনা কিংবা নাগরিক সেবা—এসব কোনো একটি দলের বিষয় নয়; এগুলো পুরো শহরের বিষয়। তাই দল-মতের বাইরে এসে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করা দরকার।
আমার মনে হয়, গুরুদাসপুর পৌরসভার এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। কোথায় রাস্তা হবে, কোথায় ড্রেন হবে, ময়লা কোথায় যাবে, বাজার ও পার্কিং কীভাবে সাজানো হবে, নদীগুলো কীভাবে রক্ষা ও পুনরুদ্ধার করা হবে, শহরের নিরাপত্তা কীভাবে বাড়ানো হবে এবং শিশু-কিশোরদের জন্য কী করা হবে—এসব বিষয় একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।
আর সামনে যারা মেয়র হওয়ার জন্য মানুষের কাছে যাবেন, তাদের কাছে আমার অনুরোধ—নির্বাচন যেন শুধু পোস্টার, ব্যানার, মিছিল বা শোডাউনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। মানুষের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হোক—গুরুদাসপুরকে নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
পৌরসভার আর্থিক সংকট কীভাবে কাটাবেন? কর্মচারীদের বেতন নিয়মিত করবেন কীভাবে? চুরি-ছিনতাই কমাতে কী করবেন? জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান কী? ময়লা-আবর্জনা কোথায় যাবে? নদীগুলোকে কীভাবে রক্ষা ও খনন করবেন? হাট-বাজার কীভাবে সুশৃঙ্খল করবেন? উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত করবেন? নাগরিক সেবা নির্দিষ্ট সময়ে কীভাবে নিশ্চিত করবেন? শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কীভাবে বাড়াবেন?
আমার কাছে মনে হয়, নির্বাচনের সময় এসব প্রশ্ন নিয়েই আলোচনা হওয়া উচিত। কারণ মেয়র হওয়া শুধু একটি পদ পাওয়া নয়; এটি একটি শহরের দায়িত্ব নেওয়া।সামনে যারা মেয়র হবেন, তারা যদি এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করেন এবং সেটি বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে কাজ করেন—তাহলেই আমার এই লেখার সার্থকতা।
আমি কাউকে সমর্থন বা বিরোধিতা করে এসব কথা বলছি না। নিজের শহরের একজন মানুষ হিসেবে শুধু এটুকুই চাই—গুরুদাসপুরের নির্বাচন যেন শুধু কে মেয়র হবেন, সেই প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং কেমন গুরুদাসপুর আমরা চাই, সেই প্রশ্নটিও সামনে আসে।সমস্যা অনেক, কিন্তু সম্ভাবনাও কম নয়। প্রয়োজন শুধু ভালো পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আন্তরিকতা এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার মানসিকতা।
প্রথম শ্রেণির পৌরসভা শুধু নামের মধ্যে নয়—নাগরিকের প্রতিদিনের জীবনেও তার প্রমাণ থাকুক।এটাই প্রত্যাশা।
এস.এম. শহিদুল ইসলাম সোহেল
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও
আইন উপদেষ্টা গুরুদাসপুর বার্তা
মন্তব্য করুন